গোকর্ণ : আ ওয়াক টু রিমেম্বার

Updated: Apr 6, 2019

অয়ন ভট্টাচার্য্য



প্রথম ভাগ :

সাড়ে সাতটা কিন্ত বেজে গেছে অনেকক্ষন, এরপর দেরি করলে সিওর বাসটা মিস হয়ে যাবে, এই কথা বলে আমি চট করে একবার হাতঘড়িটায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললাম। ক্যাব বুক হয়ে গেছে অনেকক্ষণ , পাশের ঘর থেকে তারস্বরে জানালো নন্দিনী । তার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ক্যাব ড্রাইভার আন্না ফোন করে জানালেন তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত । প্রায় পৌনে আটটা নাগাদ আমরা সপ্তাহান্তের মত পাততাড়ি গুটিয়ে রওনা হলাম । আপাতত গন্তব্য স্থল ব্যাঙ্গালোর এম জি রোড, সেখান থেকে রাত 9 টায় আমাদের বাস ছাড়বে । আমরা আসলে চলেছি গোকর্ণ , বিচ ট্রেক করতে । আমরা মানে নন্দিনী আর আমি । নন্দিনী হচ্ছে আমার মাধ্যমিকের সময়কার বন্ধু । মাধ্যমিক পরীক্ষা ইস্তক আমাদের সব কিছু একসাথে। দীর্ঘ এক দশক হাসি ঠাট্টা কান্না মান অভিমান খুনসুটি মারামারি সবকিছু একসাথে পেরিয়ে আমরা আজকে কয়েক বছর হল কলকাতা ছাড়া । আমি একটি সরকারি ব্যাংকে কর্মরত , আপাতত বাসস্থান চেন্নাই। নন্দিনী একটি মাল্টিন্যাশনাল আইটি ফার্মের কনসালটেন্ট । সে আস্তানা গেড়েছে ব্যাঙ্গালোরে। নন্দিনীর আরেকটা পরিচয় হলো সে আমার সহধর্মিনী । যাই হোক মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক , আজ সকালেই অমৃতা মেইল করে জানিয়েছে আমরা সব শুদ্ধ চোদ্দ জন চলেছি এই বিচ ট্রেকিং এ । আমরা যাচ্ছি নেচার ওয়াকার্স নামক একটি সংস্থার সাথে যারা ব্যাঙ্গালোর এবং চেন্নাই থেকে উইকেন্ড ট্রেক এর আয়োজন করে থাকে । অমৃতা এই সংস্থার সাথেই যুক্ত । আমাদের দলের বাকি সদস্যরা বাস ধরবে ডোমলুড় এবং কোরমঙ্গলা থেকে । বাস তাদের নিয়ে সবশেষে এম জি রোড আসবে আমাদের নিতে । আমরা যখন এম জি রোড এসে পৌঁছলাম ঘড়িতে তখন পৌনে নটা নেচার ওয়াকারের দেওয়া ট্যুর কোঅর্ডিনেটর এর নম্বরে ফোন করে জানতে পারলাম বাস কোরমঙ্গলা ছেড়েছে খানিক আগে , এম জি রোড এসে পৌঁছতে আরো মিনিট পনেরো লাগবে । সুতরাং এই মিনিট পনেরো সময়ে গোকর্ণর ঘাতঘোত টা একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক । গোকর্ণ আরবিয়ান সমুদ্রসৈকতে ধারে অবস্থিত কর্ণাটকের একটি শহর । শহরটি মূলত মহাবালেশ্বর মন্দির এর জন্য বিখ্যাত । তবে হালফিলে জায়গাটিকে ভারতবর্ষের হিপি ডেস্টিনেশন আখ্যা দেওয়া হয়েছে । গোকর্ণ তার সমুদ্র সৈকতের জন্য বিখ্যাত । গোকর্ণ থেকে সি লাইন ধরে 100 কিলোমিটার এগিয়ে গেলে গোয়া পৌঁছানো যায় । তারই মধ্যে ঝনঝন করে পকেটের ফোনটা বেজে উঠলো । ফোনটা রিসিভ করে কানে দিতেই অপরপ্রান্ত থেকে একজন মিহি গলায় জানালো যে বাস পৌঁছে গেছে এমজি রোডে। আমরা তড়িঘড়ি সিগন্যাল পেরোতেই রাস্তার অপর প্রান্তে ফুটপাথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাভেলার বাস থেকে দেখতে পেলাম । অমোঘ, আমাদের টুর কো-অর্ডিনেটর রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে ছিল । তার সাথে আলাপ পরিচয় সেরে তার পেছনে পেছনে আমরা বাসে গিয়ে উঠলাম । মাথার ওপরে ব্যাগ পত্র ঠেলেঠুলে ঢুকিয়ে রেখে সিট দখল করতে না করতেই বাস ছেড়ে দিল। অমোঘের সাথে কথা বলে জানলাম আমাদের এই দলের আরেক সদস্য সুশীল চৌরাসিয়া যশবন্তপুর থেকে বাস ধরবে, তাই সেখানেই যাওয়া হবে এবার। গুছিয়ে বসে পাশের জানলাটা ফাক করলাম অল্প করে। একতাল দমকা হাওয়া নন্দিনীর চুল এলোমেলো করে দিলো । বেশ মন ভালো করা মিষ্টি সোদা গন্ধ লাগলো নাকে । হু হু করে বাতাস বইছে, মিশকালো অন্ধকারের মধ্যে জানলার বাইরে হাতটা সামান্য ছুঁড়ে দিতেই হাওয়া কেটে গেলো খানিকটা , সাথে বুঝলাম বৃষ্টিও শুরু হয়েছে ঝিরি ঝিরি ।


দ্বিতীয় ভাগ :

বাস যশোবন্তপুর ছেড়েছে অনেকক্ষণ। আমরা এখন ব্যাঙ্গালোর শহরের প্রায় শেষ সীমানায় । বাসের যাত্রীরা সবাই যে যার সিটে গা এলিয়ে , কেউ বসে, কেউ বা ঝুঁকে, কেউবা মাথার টুপি মুখের উপর টেনে শুয়ে থাকার ভান করে রয়েছে , আমাদের বাসটা শহরের শেষ টোলপ্লাজা টা ক্রস করতেই আমাদের দলের আরেক ট্যুর কো-অর্ডিনেটর হর্ষিতা বলে উঠলো , কামন গাইজ লেটস ব্রেক দা আইস । চলো আমরা সবাই একে একে নিজের জায়গা ছেড়ে ড্রাইভারের সিটের পেছনে এসে দাঁড়াই আর নিজেকে মেলে ধরি বাকি সবার সামনে । এইভাবে আলাপচারিতার ম্যাধমে একে একে আমাদের দলের সকলের সাথে পরিচয় পর্ব টা সেরে ফেলা গেলো। আমাদের টিমের তিনজন কো-অর্ডিনেটর । প্রথমজন এবং সিনিয়র মোস্ট অমোঘ । অমোঘ ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা এবং মাস কমিউনিকেশন এর ছাত্র । অমোঘ নেচার ওয়াকার্স এর সাথে যুক্ত বছর খানেক ধরে এবং এই অল্প সময়ে এর মধ্যেই অমোঘ কর্ণাটক এবং তামিলনাড়ুর বেশকিছু ট্রেক কোঅর্ডিনেট করে ফেলেছে । আমাদের গ্রুপের দ্বিতীয় এবং সর্বকনিষ্ঠ কো-অর্ডিনেটর বিপুল শর্মা । বিপুল আসামের ছেলে এবং সর্বক্ষণ মিউজিক আর মাউন্টেনিয়ারিং এ মজে থাকে । বিপুল এদের মধ্যে সবচেয়ে কম কথা বলে। তার সাথে সামান্য বাক্যালাপে জানলাম সে আজ মাস কয়েক হলো ব্যাঙ্গালোরে এসেছে বিকম নিয়ে পড়তে তার সাথে কথা বলে আরও জানতে পারলাম তার হোস্টেল কলেজ থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে এবং সে রোজ হোস্টেল থেকে এক রকম ঘড়ি ধরে স্প্রিন্ট করে কলেজে যায় । বিপুল প্রথম ট্রেকে অংশগ্রহণ করে যখন ও ক্লাস ফাইভ এর ছাত্র । পশ্চিম বাংলার সান্দাকফু ট্রেক এবং বিপুলের কথায় তার জীবনের অন্যতম সেরা ট্রেকিং এক্সপেরিয়েন্স। কো-অর্ডিনেটর টিমের তৃতীয় ও একমাত্র মহিলা সদস্য হার্শিতা। হার্শিতা ম্যাঙ্গালোরের মেয়ে । পড়াশোনা সূত্রে নিজের বাবা মা পরিবার ছেড়ে বেশ কয়েক বছর ব্যাঙ্গালোরে হোস্টেলে বসবাস করছে । হার্শিতা এই নিয়ে দ্বিতীয়বার গোকর্ন বিচ ট্রেকে পার্টিসিপেট করছে । যদিও এইবার তার অনিচ্ছাসত্ত্বেও একপ্রকার জোর করেই তাকে কোঅর্ডিনেটর হিসেবে আমাদের সাথে পাঠানো হয়েছে । আমাদের বাস তখন ন্যাশনাল হাইবে ফর্টি এইট হয়ে তীর বেগে ছুটে চলেছে আর বাসের ভিতর পুরোদমে চলছে ইন্ত্রডাক্টরি সেশন । বাকিদের মধ্যে সর্বপ্রথম নিজেদের ইন্ট্রোডাকশন দিল লিনফোর্ড আর এন্যেট এনা জেমস। লিনফোর্ড আর এনার মাস কয়েক হলো বাগদান পর্ব মিটেছে । আগামী মে মাসে বিয়ে দুজনের, সুতরাং বিয়ের আগে এটা তাদের শেষ ব্যাচেলর ট্রিপ । দুজনেই ক্যাথলিক খ্রিস্টান এবং কেরালা ত্রিশূর এর বাসিন্দা হলেও কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালোরে আছে করে বেশ কয়েক মাস । দুজনেই আইটি প্রফেশনাল। লিনফোর্ডের নেশা ফুটবল এবং সে তার স্কুল ও কলেজ জীবনে চুটিয়ে ফুটবল খেলেছে শুধু তাই ই নয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তার কলেজের হয়ে রিপ্রেজেন্ট করেছে । ওপর দিকে এনার খেলাধুলা তে বিশেষ আগ্রহ নেই । সে চায় ফ্যাশন ফটোগ্রাফার হতে এবং সেই সূত্রে বিভিন্ন ফটোগ্রাফি ক্লাবের সাথেও যুক্ত । তারপর আলাপ হলো সুর আর জেনির সাথে । সুরের পুরো নাম আমি আজ অব্দি উচ্চারণ করে উঠতে পারিনি । জেনি ওরফে জেনি জেরেমায়া সুরের স্ত্রী এবং অন্যতম ট্রাভেল পার্টনার ।সুর ইউ পির ছেলে হলেও বাবার এয়ারফোর্স এর চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেছে । সুর একটি ফরাসি ব্যাংকের আই টি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডিপার্টমেন্ট এর হেড । জেনি মালায়লি হলেও বাড়ি কন্যা কুমারী তে। জেনি একটি বেসরকারি সংস্থার হিউম্যান রিসোর্সের দ্বায়িত্ব সামলায়। দুজনেই ট্রেকিং ভালোবাসে এবং দু বছর আগে কোন একটি ট্রেকে আলাপ এই দুই ট্রেক যুগলএর । গত বছর অক্টোবর মাসেএনারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন । এবার আসি স্নেহা আর অনুরাগ এর কথায়। দুজনেই দিল্লির বাসিন্দা এবং কর্মসুত্রে ব্যাঙ্গালোরে বসবাস করে । হাসিঠাট্টার মাঝে জানতে পারলাম অনুরাগ তার ভুলো মনের জন্য বন্ধুদের কাছে বারংবার অপদস্ত হয় এবং স্নেহার ঘন ঘন অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে । স্নেহার মুখে শুনলাম অনুরাগ নাকি তাদের প্রথম ডেটে নিজের ওয়ালেট ভুলবশত বাড়িতে ফেলে আসে আর রেস্টুরেন্টের বিল মেটানোর সময় সেটা তার বোধগম্য হয় । ডেট পর্ব মিটতে স্নেহা অনুরাগ এর জন্য নিজের ফোন থেকে ক্যাব বুক করে ওকে বাড়ি পাঠায় অথচ তার যে বাড়ি ফিরে স্নেহাকে খবর দেওয়া উচিত সে কথাটা অনুরাগ জি বেমালুম ভুলে মেরে দেয় । পরে জিজ্ঞেস করা হলে অনুরাগের অকাট্য যুক্তি ক্যাব তো নেহার ফোনে বুক করা , আমি বাড়ি পৌঁছেছি কিনা তার আপডেট তো ও নিজের ফোন থেকেও পেতে পারে । বাসে একটা ছোট খাটো হাসির কলরব ওঠে । হাসির রেশ এবং উদ্যম কমতে আমাদের গ্রুপের আরেক সদস্য শাহরুখ খান নিজের পরিচয় দেন । না এনি কিং খান নন তবে ইনিও দিল্লির বাসিন্দা এবং সেলস এর চাকরির সুবাদে ব্যাঙ্গালোর কে ভালোবেসে ফেলেছেন । ঘটনাচক্রে সেইদিন খান সাহেবের জন্মদিন ও বটে এবং সে কথা বাসের বাকি লোকেরা জানতে পারার পর বার্থডে বাম্প এর সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে ওনার শেষটায় উরি বাবা অবস্থা হয়েছিল । পরে ওর কাছে শুনেছিলাম যে এই ঘটনার পর আগামী দুদিন ও বিছানায় চিৎ হয়ে শোয়ার শক্তি, সামর্থ্য সব হারিয়েছিল । আমাদের দলের আরেক সদস্য ছিল জে ডি , পুরো নাম মনে নেই এই মুহূর্তে । জে ডি ওয়েস্ট বেঙ্গল এ জন্মালেও বড় হয়েছে ত্রিপুরায় এবং এখন কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালোরের রেসিডেন্ট । জে ডি পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার । মারাঠি মুলগী রস্মির বাড়ি মুম্বাইতে । আমাদের দলের অনলি সোলো ফিমেল ট্রাভেলার । রশ্মি চাকরি করে ফ্লিপকার্টে, সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে । রস্মির গত দু'মাসের মধ্যে এটা দ্বিতীয় গোকর্ণ ট্রিপ । রস্মি বেশ মিশুকে, খানিক টা গায়ে পড়া , কনফিডেন্ট এন্ড আউটগোয়িং এবং প্রাণোচ্ছল । আমাদের দলে আয়ুস এবং আকাঙ্ক্ষা ও ছিল যদিও তাদের সাথে আমার আলাপ জমে নি সেরকম। আয়ুস ছিল কোরিওগ্রাফার এবং এবং টাটকা প্রেমিক হওয়ায় তাকে সর্বক্ষণ আকাঙ্খার সাথে আলিঙ্গনবব্ধ অবস্থাতেই দেখতে পেতাম । কে জানে চোখের বা মনের ভুল ও হতে পারে, অথবা দুটোই । যাক গে সে সব কথা , কাজের কথায় মননিবেষ করি বরং । আমাদের দলের শেষ সদস্য মধ্যপ্রদেশের সুশীল চৌরাসিয়া । সুশীল গ্রামের ছেলে, বাকিদের মত গড় গড় করে ইংলিশ বলতে পারে না । হিন্দি বলে , দেহাতি উচ্চারণে , কথা বার্তায় মাটির টান স্পষ্ট । প্রথম দর্শনে গাইয়া মনে হলেও ছেলেটির সরলতা এবং কথার ধার, ভার, বাঁধুনি দেখে ভালোলাগতে বাধ্য । সুশীল ব্যাঙ্গালোর আইএসআই এর ছাত্র , ভবিষ্যতে গণিতের প্রফেসর হওয়ার ইচ্ছে এবং গত তিন মাস ধরে ও লাগাতার উইকেন্ড ট্রেকিং এ অংশগ্রহণ করে চলেছে । সুশীল এর আরেকটি শখ হল ভিডিও ব্লগিং । তার সমস্ত ঘুরে বেড়ানোর জায়গার ভিডিও রেকর্ডিং করে সে ব্লগ বানায় । এই আলাপচারিতা ক্রমশ জমে ওঠায় কখন যে রাতের খাবারের সময় হয়েছে কারুরই খেয়াল ছিল না । রাত পৌনে বারোটা নাগাদ আমাদের বাস টুমকুর ছাড়িয়ে একটি রোডসাইড ধাবায় খানিকক্ষণের জন্য থামল । রাত সাড়ে বারোটার মধ্যে খাওয়া-দাওয়ার পাঠ চুকিয়ে আমরা আবার বাসে চড়ে বসে রওনা দিলাম আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে । ইতিমধ্যে হার্ষিতা জানাল আমাদের গোকর্ণ পৌঁছতে আগামীকাল ভোর সাতটা বেজে যাবে । আমি এইসব ঘোরা ঘুরির ব্যাপারে বরাবরই একটু ইমপেসেন্ট । হর্ষিতার কথা শোনা ইস্তক ভোর হওয়ার জন্য উসখুস করছিলাম । দেখতে দেখতে রাত একটার মধ্যে চারিদিক নিঝুম হয়ে গিয়ে যে যার মত ঘুমে তলিয়ে গেল। কেউ বসে , কেউ পুশ ব্যাক সিটে হেলান দিয়ে , কেউবা দুটো সিটের মাঝে পা ছড়িয়ে , কেউ বাসের দেওয়ালে পা তুলে দিয়ে ,কেউ আবার প্রবল নাসিকা গর্জনে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়ল । আমার পাশে বসা নন্দিনী ও ঘাড় কাত করে সামান্য মুখ হা করে ঘুমিয়ে কাদা । সবাই যখন ঘুমের দেশে , তখনও গোটা বাসে দুটো প্রাণী জেগে । ড্রাইভার ভাইসাব নিবিষ্ট মনে হাওয়ার গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছে আর আমি অস্থির মনে গোকর্ণ পৌঁছানোর অপেক্ষা করে চলেছি । যেন পাল্লা দিয়ে রাত জাগার অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে দুজনের । আর জেগে আছে বৃষ্টির মেঘের ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়ানো উজ্জ্বল তামাটে আভায় উপচে পড়া একফালি চাঁদ টা । হালকা বৃষ্টির পরে আকাশে জায়গায় জায়গায় পেঁজা তুলোর মত গোছা গোছা মেঘ ফুটে আছে । গোকর্ণ পৌঁছনো এবং আগামীকালের ট্রেকিং অ্যাক্টিভিটি নিয়ে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমার চোখের পাতা দুটো জড়িয়ে এলো । পাশ দিয়ে একটা মফস্বল এর বাস প্যা প্যা প্যা প্যা সুর তুলে দারুণ গতিতে অন্ধকার চিরে ছুটে বেরিয়ে গেল । ঘুমচোখ খুলে বিরক্ত চোখে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে চাইলাম । আকাশের দিকে তাকিয়ে আধবোজা চোখে চাঁদটাকে মেপে আবার চোখ বুজলাম ।

তৃতীয় ভাগ :

নাহ, আজকের রাতটা বালির ওপরেই শুয়ে বসে কাটাতে হবে মনে হচ্ছে, অমলেটের টুকরোটা পাউরুটির ভেতর গুঁজতে গুঁজতে বলল জেনি । আমরা গতবার যখন গোকর্ণ এসেছিলাম নেচার ওয়াকার্স এর সাথে , সেবার ওরা সবাই কে ইন্ডিভিজুয়াল কটেজে থাকতে দিয়েছিল, সুর বাবু বৌ এর কথার সুর টেনে বলল । আর যাই হোক টেন্টে রাত কাটানো আমার পক্ষে একপ্রকার অসম্ভব ,কাঁধ ঝাকিয়ে তালে তাল মেলালো এনা । আমরা গোকর্ণ এসে পৌঁছেছি ঘন্টা খানেক হলো । রাতে ঘুম তেমন হয়নি আমার এবং নন্দিনী ও একই কথা বলল নিজের ঘুম সম্পর্কে । যদিও আমি ঘড়ি ধরে গুনেছি ও পাক্কা ছটি ঘন্টা ঘুমিয়েছে কাল রাত থেকে । সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ বাস আমাদেরকে গোকর্ণ টাউনের বাস ডিপোতে নামিয়ে দেয় । সেখান থেকে নেচার ওয়াকার্সের বন্দোবস্ত করা আরেকটি ট্রাভেলার এ চড়ে আমরা গোকর্ণ মেন বিচের সংলগ্ন এলাকায় এসে পৌঁছলাম । বাস রাস্তা যেখানে শেষ হচ্ছে সেখান থেকে গোকর্ণ বিচ প্রায় দেড় কিলোমিটারের পথ । কাঁচা মেঠো রাস্তা , তার দুপাশে ঝোপঝাড় , আগাছা, কাটা গাছ আর কিছু একচালা কুঁড়েঘর । সেই লাল মাটির এবড়ো খেবরো উঁচু নিচু রাস্তা ধরে সোজা হেটে যেতেই খানিক পরে সমুদ্রের গন্ধ নাকে এলো । আরো কিছুদূর চলার পর , সোজা ঢালু রাস্তা যেখানে নেমে গেছে সেখানে হালকা নীলচে সমুদ্রের রেখা দেখতে পেলাম । রাস্তাটা এসে মিশেছে সমুদ্র সৈকতের বালিতে । বালির উপর দিয়ে কিছুটা হাঁটলেই আরব সাগর । গরমে খানিকটা কাহিল আর নিস্তেজ । ছোট ছোট ঢেউ গুলো কেমন মাথাচাড়া দেওয়ার আগেই বালিতে লুটিয়ে পড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে । আবার খানিক পর আরেকটা কমজোরি ঢেউ এসে সেগুলো কে কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে । এই সব দেখতে দেখতে আমরা বালির উপর দিয়ে দক্ষিণ দিকে মুখ করে হেঁটে চললাম । আগে আগে চলেছে আমাদের তিন বিশ্বস্ত সেনাপতি , অমোঘ, বিপুল এবং হার্শিতা। কিছুক্ষণ চলার পর আমাদের হোমস্টের দেখা মিলল । হোম স্টে তে আমাদের জন্য দুটো ঘরে বন্দোবস্ত করা ছিল । একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে দের । হোমস্ স্টে তে ঢোকা মাত্রই যে যার নিজেদের ঘর গুলিতে পৌঁছে ব্যাগ পত্র ছেড়ে কাঁধে তোয়ালে ঝুলিয়ে দুদ্দাড় করে বাথরুমের দিকে ছুটলাম । ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকায় আমি প্রথম চেষ্টাতেই বাথরুম ব্যবহার করার সুযোগ পেলাম । ঘর গুলি থেকে খানিক দূরে সারি দেওয়া পর পর ছটি বাথরুম । হার্শিতা ভোরবেলাতেই জানিয়ে দিয়েছিল আজকে আমাদের সকলের বালতি মগ নিয়ে স্নানের ছুটি । গোসল পর্ব সমুদ্রতেই সারা হবে । সুতরাং আমরা যে যার মত হাত মুখ ধুয়ে প্রকৃতির ডাকের সাড়া মিটিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে বিচ লাগোয়া শ্যাক এ এসে হাজির হলাম । বুফে ব্রেকফাস্ট । আয়োজন খুব বেশি নয় । ইডলি , বড়া, সম্বর, চাটনি , পাউরুটি অমলেট আর সামান্য কাট ফ্রুটস দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারা হল । আয়োজন এলাহি না হলেও সবটাই বাড়ির রান্না এবং সুস্বাদু । ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে হঠাৎ চোখ গেল বিচের ওপর পেতে রাখা সারি সারি টেন্ট গুলোর দিকে । আমাদের প্ল্যান অনুযায়ী আজ রাতে ওই গুলোই আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই । টেন্ট দেখে অনেকেরই চোখ কপালে উঠলো । কয়েকজনের মুখের অবস্থা তো দেখার মত । আমাদের দলের জেনি রাত কাটানোর এই সুবন্দোবস্থ দেখে কেমন একটা ভেবলে গিয়ে বিষম খেয়ে অস্থির । তবে আমি যারপরনাই খুশি হয়েছিলাম । খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো আমার বহুদিনের শখ এবং তার সাথে উপরি পাওনা আকাশ ভরা ফুলের কুঁড়ির মত ফুটে থাকা তারাদের মেলা, মিঠে মনমাতানো সি ব্রিজ আর সমুদ্রের তর্জন গর্জন । এইসবের আধঘণ্টার মধ্যে ব্রেকফাস্ট পর্ব সেরে আমরা যে যার মত তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলাম । আমাদের সকলেরই পরনে টি শার্ট এবং শর্ট বা ট্রেকিং ট্রাউজার্স । কাঁধের জলের বোতল এবং অন্যান্য ট্রেকিং সরঞ্জামসহ ছোট ব্যাগ । অনেকের মাথায় টুপি বা ব্যান্ডানা । চোখে রোদচশমা । সকলেই মোটামুটি যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে রেডি । সেনাপতিরা শিঙে ফুকলেই সবাই রে রে করে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে পড়বে । আমাদের ট্রেকিংয়ের রুট ম্যাপ টা একবার জানিয়ে রাখা যাক । আমরা গোকর্ণ বিচ থেকে সামনের দিকে হেঁটে গডস ওন বিচে পৌঁছাব । সেখান থেকে সামনের দিকে অগ্রসর হলে আমাদের রাস্তায় একে একে পড়বে প্যারাডাইস বিচ, হাফ মুন বিচ , ওম বীচ , কুডলে বিচ এবং সেখান থেকে আরও সামনে হেটে আমরা আবার আমাদের হোমস্টে তে ফিরে আসব । গোকর্ণ বিচ যেমনটা ভাবছো আদপে তেমন টাএকেবারেই নয় । গোকর্ণ তে এক বিচ থেকে অপর বিচে পৌঁছতে রীতিমত পাহাড় ডিঙাতে হয় । তুলনায় বালির উপরে হাঁটাহাঁটি কম । ঘড়িতে তখন সাড়ে নটা , আমরা একে একে লাইন করে আমাদের হোমস্টের গেটের সামনে এসে জড়ো হলাম । অমোঘ সবাইকে এক ফ্রেমে রেখে তার ফোনের ক্যামেরায় একটি ছবি তুলল । আমাকে তখন সমুদ্রে পেয়েছে, আমি হাঁ করে নিবিড় মনে সমুদ্রের ঢেউয়ের উথাল-পাথাল গিলছি । কতক্ষণ পরে খেয়াল নেই অমোঘ এর গলা পেলাম, কাম অন হারি আপ । পাশ ফিরে দেখি বাকিরা হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে ,মায় নন্দিনীও,আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হ্যাচর প্যাঁচর করতে